
নাজজেদা নাহার : আত্মহত্যা একটি অত্যন্ত জটিল ও বহুমাত্রিক জনস্বাস্থ্য সমস্যা। এটিকে শুধুমাত্র কোনো একটি মানসিক রোগের ফল হিসেবে দেখলে বিষয়টির প্রকৃত বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা অসম্পূর্ণ থেকে যায়। আধুনিক গবেষণা বলছে, আত্মহত্যার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে ব্যক্তিগত, মনস্তাত্ত্বিক, আন্তঃব্যক্তিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক এবং পরিবেশগত বিভিন্ন উপাদানের পারস্পরিক প্রভাবে। অর্থাৎ একজন মানুষের আত্মহত্যার চিন্তা বা আচরণকে বুঝতে হলে তার মানসিক অবস্থা যেমন দেখতে হবে, তেমনি তার পারিবারিক সম্পর্ক, সামাজিক সংযোগ, জীবনের সাম্প্রতিক সংকট, দীর্ঘমেয়াদি অভিজ্ঞতা এবং মানসিক স্বাস্থ্যের ইতিহাসও বিবেচনা করতে হবে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, প্রতিবছর বিশ্বে ৭,০০,০০০-এরও বেশি মানুষ আত্মহত্যার কারণে মারা যান এবং ১৫–২৯ বছর বয়সীদের মধ্যে আত্মহত্যা মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ। বৈশ্বিক আত্মহত্যার বড় অংশ নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে ঘটে। ডব্লিউএইচও আত্মহত্যাকে একটি প্রতিরোধযোগ্য জনস্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে বিবেচনা করে। এর অর্থ হলো আত্মহত্যাকে শুধুমাত্র একটি ব্যক্তিগত ঘটনা হিসেবে না দেখে জনস্বাস্থ্য, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা, পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং সামাজিক নীতির সম্মিলিত দৃষ্টিকোণ থেকে মোকাবিলা করা প্রয়োজন।
আধুনিক সুসাইডোলজির একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা হলো, সুসাইডাল আইডিয়াশন এবং সুসাইডাল বিহেভিয়ার একই বিষয় নয়। একজন মানুষ আত্মহত্যার চিন্তায় ভুগতে পারেন, কিন্তু সেই চিন্তা থেকে আত্মহত্যামূলক আচরণে যাবেন—এমন নিশ্চয়তা নেই। আবার কিছু মানুষ সুসাইডাল আইডিয়াশন থেকে পরবর্তীতে সুসাইডাল বিহেভিয়ারের দিকে যেতে পারেন। তাই আধুনিক গবেষকরা দুটি আলাদা প্রশ্ন করার চেষ্টা করেন—কেন একজন মানুষের আত্মহত্যার চিন্তা তৈরি হয় এবং কেন কিছু মানুষ সেই চিন্তা থেকে আচরণের দিকে এগিয়ে যান, অথচ অন্যরা যান না। এই ধারণাকে ব্রডলি আইডিয়াশন-টু-অ্যাকশন ফ্রেমওয়ার্ক বলা হয়।
আত্মহত্যার চিন্তা বোঝার ক্ষেত্রে সাইকোলজিক্যাল পেইন এবং হোপলেসনেস অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একজন মানুষ যখন দীর্ঘস্থায়ী ও তীব্র মানসিক যন্ত্রণার মধ্যে থাকেন এবং একই সঙ্গে মনে করতে শুরু করেন যে ভবিষ্যতে পরিস্থিতির কোনো পরিবর্তন হবে না, তখন সুসাইডাল আইডিয়াশনের ঝুঁকি বাড়তে পারে। ক্লনস্কি ও মে-এর থ্রি-স্টেপ থিওরিতে সাইকোলজিক্যাল পেইন এবং হোপলেসনেসকে সুসাইডাল আইডিয়াশন তৈরির গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। তবে এই থিওরিকে আত্মহত্যার সম্পূর্ণ ব্যাখ্যা হিসেবে দেখা ঠিক নয়; বিভিন্ন গবেষণায় এর বিভিন্ন অংশের জন্য সমর্থন পাওয়া গেলেও সব প্রেডিকশনের এভিডেন্স সমান শক্তিশালী নয়।
আত্মহত্যার ক্ষেত্রে মানুষের সামাজিক সম্পর্কও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। থমাস জয়নারের ইন্টারপার্সোনাল থিওরি অব সুসাইড অনুযায়ী, একজন মানুষ যখন মনে করেন যে তিনি অন্যদের সঙ্গে সত্যিকারেরভাবে কানেক্টেড নন, তখন তার মধ্যে থোয়ার্টেড বিলংগিংনেস তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে যখন তিনি মনে করেন যে তিনি অন্যদের জন্য একটি বোঝা, তখন তৈরি হতে পারে পারসিভড বার্ডেনসামনেস। এই দুই ধরনের ইন্টারপার্সোনাল এক্সপেরিয়েন্স একসঙ্গে তীব্র হলে সুসাইডাল ডিজায়ারের ঝুঁকি বাড়তে পারে। তবে গবেষণা এটাও দেখিয়েছে যে ইন্টারপার্সোনাল থিওরির সব প্রেডিকশন সমানভাবে শক্তিশালী নয়; তাই এটিকে আত্মহত্যার চূড়ান্ত ব্যাখ্যা হিসেবে নয়, বরং একটি গুরুত্বপূর্ণ থিওরেটিক্যাল ফ্রেমওয়ার্ক হিসেবে দেখা বেশি বৈজ্ঞানিক।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যাখ্যা পাওয়া যায় ইন্টিগ্রেটেড মোটিভেশনাল-ভোলিশনাল মডেল বা আইএমভি-তে। এই মডেলে আত্মহত্যার চিন্তা তৈরির ক্ষেত্রে ডিফিট এবং এনট্র্যাপমেন্টের ভূমিকা বিশেষভাবে বিবেচনা করা হয়। একজন মানুষ যখন নিজেকে পরাজিত, ব্যর্থ বা ডিফিটেড মনে করেন এবং এরপর মনে করেন যে তিনি সেই পরিস্থিতি থেকে বের হওয়ার কোনো পথ খুঁজে পাচ্ছেন না, তখন এনট্র্যাপমেন্ট বা আটকে পড়ার অনুভূতি তৈরি হতে পারে। এই সাইকোলজিক্যাল পাথওয়ের সঙ্গে সুসাইডাল আইডিয়াশনের সম্পর্ক নিয়ে গবেষণায় উল্লেখযোগ্য এমপিরিক্যাল সাপোর্ট পাওয়া গেছে। তবে মডেলের সব কম্পোনেন্টের এভিডেন্স একই মাত্রায় শক্তিশালী নয়।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, একই ধরনের বিপর্যয় বা স্ট্রেসর সবার মধ্যে একই ধরনের সুসাইডাল রেসপন্স তৈরি করে না। এই বিষয়টি বোঝাতে স্ট্রেস-ডায়াথিসিস পারসপেক্টিভ ব্যবহার করা হয়। একজন ব্যক্তির মধ্যে আগে থেকেই কিছু ভালনারেবিলিটি থাকতে পারে—যেমন পূর্ববর্তী ট্রমা, ইমপালসিভিটি, সাইকিয়াট্রিক ভালনারেবিলিটি, বায়োলজিক্যাল সেনসিটিভিটি অথবা দীর্ঘমেয়াদি সাইকোলজিক্যাল ডিফিকাল্টি। এর সঙ্গে যদি কোনো অ্যাকিউট স্ট্রেসর যুক্ত হয়, তাহলে সুসাইডাল রিস্ক বৃদ্ধি পেতে পারে। তাই শুধু “কী ঘটেছিল?” প্রশ্ন করলেই হবে না; বরং “এই ঘটনার আগে ব্যক্তির সাইকোলজিক্যাল ভালনারেবিলিটি কেমন ছিল?”—সেটিও দেখতে হবে।
আত্মহত্যার সঙ্গে বিভিন্ন মেন্টাল হেলথ কন্ডিশনের সম্পর্ক রয়েছে। ডিপ্রেশন, সাবস্ট্যান্স ইউজ, সিভিয়ার সাইকোলজিক্যাল ডিস্ট্রেস, ক্রনিক পেইন এবং ইমোশন রেগুলেশনের সমস্যার মতো বিষয়গুলো ঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। একইভাবে ইন্টারপার্সোনাল লেভেলে লোনলিনেস, রিজেকশন, রিলেশনশিপ কনফ্লিক্ট, বুলিং, ফ্যামিলি ভায়োলেন্স এবং পারসিভড বার্ডেনসামনেস গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। সোশ্যাল লেভেলে আনএমপ্লয়মেন্ট, ফাইন্যান্সিয়াল স্ট্রেস, ডিসক্রিমিনেশন, সোশ্যাল এক্সক্লুশন এবং মেন্টাল হেলথকেয়ারের সীমিত অ্যাক্সেস ঝুঁকি বাড়াতে পারে। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক সতর্কতাটি হলো—কোনো রিস্ক ফ্যাক্টর থাকা মানেই একজন ব্যক্তি আত্মহত্যা করবেন, এমন নয়। রিস্ক ফ্যাক্টর প্রোবাবিলিটি বাড়াতে পারে, কিন্তু ভবিষ্যৎ আচরণ নিশ্চিত করে না।
আত্মহত্যা বোঝার ক্ষেত্রে প্রোটেক্টিভ ফ্যাক্টরসও সমান গুরুত্বপূর্ণ। ফ্যামিলি সাপোর্ট, সোশ্যাল কানেক্টেডনেস, সাপোর্টিভ ফ্রেন্ডশিপ, হোপ, প্রবলেম-সলভিং স্কিল, ইমোশনাল রেগুলেশন, মিনিংফুল রোলস, ফিউচার গোলস এবং মেন্টাল হেলথকেয়ারের অ্যাক্সেস একজন মানুষের সংকট মোকাবিলার ক্ষমতা বাড়াতে পারে। অর্থাৎ সুসাইড প্রিভেনশনের লক্ষ্য শুধু রিস্ক ফ্যাক্টর কমানো নয়; বরং একজন মানুষের জীবনে এমন সম্পর্ক, দক্ষতা ও ভবিষ্যৎ-ভিত্তিক অর্থ তৈরি করা, যা তাকে সংকটের সময় টিকে থাকতে সাহায্য করে।
আত্মহত্যার ঝুঁকি প্রেডিক্ট করাও অত্যন্ত কঠিন। কারণ সুসাইডাল বিহেভিয়ার তুলনামূলকভাবে রেয়ার আউটকাম, রিস্ক সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হয় এবং একই রিস্ক ফ্যাক্টর বিভিন্ন মানুষের ক্ষেত্রে ভিন্নভাবে কাজ করতে পারে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সুসাইডাল আইডিয়াশন এবং সুসাইড অ্যাটেম্পটের ডিটারমিন্যান্টস পুরোপুরি একই নয়। এ কারণে কোনো স্ক্রিনিং টুল বা স্ট্যাটিস্টিক্যাল মডেল একজন ব্যক্তি ভবিষ্যতে আত্মহত্যা করবেন কি না—এটি নিশ্চিতভাবে বলে দিতে পারে না। আধুনিক গবেষণায় প্রেডিক্টিভ মডেল তৈরির চেষ্টা চলছে, কিন্তু এগুলোকে ক্লিনিক্যাল জাজমেন্ট এবং কমপ্রিহেনসিভ অ্যাসেসমেন্টের বিকল্প হিসেবে দেখা যায় না।
বাংলাদেশের মতো নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও জটিল। মেন্টাল হেলথ সার্ভিসের সীমাবদ্ধতা, স্টিগমা, ট্রিটমেন্ট গ্যাপ, পারিবারিক ডাইনামিকস, ইকোনমিক স্ট্রেস, রিলেশনশিপ কনফ্লিক্ট, জেন্ডার-রিলেটেড ভালনারেবিলিটি, রুরাল–আর্বান ডিফারেন্স, কালচারালি স্পেসিফিক বিলিফ এবং হেল্প-সিকিং বিহেভিয়ার—এসব বিষয় সুসাইড রিসার্চ ও প্রিভেনশনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। তাই বাংলাদেশের জন্য ইন্টারভেনশন তৈরি করতে হলে শুধু বিদেশি গবেষণা অনুসরণ করলেই হবে না; স্থানীয় সংস্কৃতি, পরিবারব্যবস্থা, সামাজিক বাস্তবতা এবং হেলথকেয়ার অ্যাক্সেসিবিলিটিও বিবেচনা করতে হবে।
সবশেষে বলা যায়, আত্মহত্যা কোনো সিঙ্গেল-কজ ফেনোমেনন নয়। এটিকে বোঝার জন্য আমাদের একই সঙ্গে দেখতে হবে মানুষের বায়োলজিক্যাল ভালনারেবিলিটি, সাইকোলজিক্যাল পেইন, হোপলেসনেস, ইন্টারপার্সোনাল রিলেশনশিপ, সোশ্যাল এনভায়রনমেন্ট, কালচার এবং অর্থনৈতিক বাস্তবতা। আধুনিক সুসাইডোলজি আমাদের শেখাচ্ছে যে সুসাইডাল থট এবং সুসাইডাল অ্যাকশন আলাদা প্রক্রিয়া; একইভাবে রিস্ক ফ্যাক্টর থাকা মানেই আত্মহত্যা অনিবার্য নয়। বরং সোশ্যাল সাপোর্ট, কানেক্টেডনেস, হোপ, ইমোশন রেগুলেশন এবং ইফেক্টিভ ট্রিটমেন্টের মতো প্রোটেক্টিভ ফ্যাক্টর একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
তাই আত্মহত্যা নিয়ে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি হওয়া উচিত বিচার নয়, বোঝাপড়া; লজ্জা নয়, সহায়তা; নীরবতা নয়, নিরাপদ কথোপকথন। কেউ যদি আত্মহত্যার কথা বলেন, সেটিকে উপহাস বা “অ্যাটেনশন-সিকিং” বলে উড়িয়ে না দিয়ে গুরুত্বের সঙ্গে শোনা এবং প্রয়োজন হলে দ্রুত পরিবার, মানসিক স্বাস্থ্য পেশাজীবী বা জরুরি সহায়তার সঙ্গে যুক্ত করা গুরুত্বপূর্ণ। আত্মহত্যার বৈজ্ঞানিক গবেষণার সবচেয়ে বড় উদ্দেশ্য শুধু মানুষ কেন আত্মহত্যার কথা ভাবেন তা বোঝা নয়; বরং কীভাবে সেই সংকটের সময় একজন মানুষকে নিরাপদ রাখা যায় এবং জীবনের সঙ্গে আবার সংযুক্ত করা যায়—সেটি খুঁজে বের করা। লেখক : সাইকোলজিস্ট ব্লেসড হোমস, চট্টগ্রাম।
অপরাধ ঘোষনা aporadhghoshona
