
অনলাইন ডেস্ক: সাইরেন বাজিয়ে ছুটে চলা অ্যাম্বুলেন্সের ভেতর যখন রোগী কিংবা লাশ নিয়ে স্বজনদের মন জুড়ে বিষণ্নতা, তখন ভাড়া নিয়ে দর কষাকষির ভাবনা কিছুটা আড়ালেই থেকে যায়। এই সুযোগটাই হাতছাড়া করে না অ্যাম্বুলেন্স মালিক-চালকরা।নীতিমালা না মেনে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়, নির্দিষ্ট অ্যাম্বুলেন্সে যেতে বাধ্য করা, চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল এলাকায় বাইরের অ্যাম্বুলেন্সে রোগী ও লাশ পরিবহনে নিষেধাজ্ঞার অঘোষিত নিয়মে মালিক-চালক সিন্ডিকেটের কাছে জিম্মি সেবা প্রত্যাশীরা।চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন এবং চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের উদ্যোগে রোগী ও লাশ পরিবহন নীতিমালা সংশোধিত-২০২৫) করা হয় ২০২৫ সালের ১৮ জানুয়ারি।গত বছরের ১৬ জুন স্টেক হোল্ডারদের নিয়ে আয়োজিত সভায় বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্সের ভাড়া পুনর্মূল্যায়ন করে ১০ শতাংশ বাড়ানো হয়।তালিকা অনুযায়ী, চট্টগ্রাম মহানগরে ৫ কিলোমিটার পর্যন্ত যাওয়া-আসার ভাড়া ছোট বা বড় নন-এসি অ্যাম্বুলেন্সে ৮৮০ টাকা এবং এসি ও ফ্রিজার ভ্যানের জন্য ৯৯০ টাকা।১০ কিলোমিটার পর্যন্ত ভাড়া যথাক্রমে ১৩২০ টাকা ও ১৪৩০ টাকা। ১৫ কিলোমিটার পর্যন্ত ভাড়া ১৯৮০ টাকা ও ২৯৯০ টাকা।চট্টগ্রাম বিমানবন্দর এলাকা পর্যন্ত ৪৫ কিলোমিটার দূরত্বের ভাড়া ২৪২০ টাকা ও ২৭৫০ টাকা।চমেক হাসপাতালের অর্থোপেডিক্স ওয়ার্ড থেকে ছাড়পত্র দেওয়ার পর এক রোগীকে চকবাজার গণি কলোনির বাসায় নিতে অ্যাম্বুলেন্স ভাড়া করেন তাঁর সন্তান সঞ্জয় পাল। প্রায় দেড় কিলোমিটার দূরত্বের ভাড়া সর্বোচ্চ ৮৮০ টাকা হলেও তাকে পরিশোধ করতে হয়েছে ১ হাজার টাকা। এই হাসপাতাল থেকে সাড়ে ৩ কিলোমিটার দূরত্বে এনায়েত বাজার এলাকায় এক প্রসূতিকে নিয়ে পৌঁছে দেওয়ার জন্য অভিভাবককে অ্যাম্বুলেন্স ভাড়া দিতে হয়েছে ২ হাজার ৫শ টাকা।
হাসপাতালের দেওয়া তালিকায় চট্টগ্রাম জেলার মধ্যে মীরসরাইয়ে ১১২ কিলোমিটার পর্যন্ত যাওয়া-আসার ভাড়া ছোট বা বড় নন-এসি অ্যাম্বুলেন্সে ৩৩৭৪ টাকা এবং এসি ও ফ্রিজার ভ্যানের জন্য ৩৯৯০ টাকা। কর্ণফুলী উপজেলা পর্যন্ত ১২ কিলোমিটারের ভাড়া যথাক্রমে ১৮৩৪ টাকা ও ১৯০০ টাকা, চন্দনাইশ উপজেলা পর্যন্ত ৮২ কিলোমিটারের ভাড়া ২৯১২ টাকা থেকে ৩১৮৩ টাকা ও এসি-ফ্রিজার ভ্যানের জন্য ৩৩৬৩ টাকা, পটিয়া উপজেলা পর্যন্ত ৫০ কিলোমিটারের ভাড়া ২৪২০ টাকা থেকে ২৫৮৫ টাকা এবং এসি-ফ্রিজার ভ্যানের জন্য ২৬৯৫ টাকা, ফটিকছড়ি উপজেলা পর্যন্ত ৬৮ কিলোমিটারের ভাড়া ২৬৯৭ টাকা থেকে ২৯২১ টাকা এবং এসি-ফ্রিজার ভ্যানের জন্য ৩০৭১ টাকা, বাঁশখালী উপজেলা পর্যন্ত ৯০ কিলোমিটারের ভাড়া ৩০৩৬ টাকা থেকে ৩৩৩৩ টাকা এবং এসি-ফ্রিজার ভ্যানের জন্য ৩৫৩১ টাকা, বোয়ালখালী উপজেলা পর্যন্ত ২৪ কিলোমিটারের ভাড়া ২০১৯ টাকা থেকে ২০৯৮ টাকা এবং এসি-ফ্রিজার ভ্যানের জন্য ২১৫১ টাকা, আনোয়ারা উপজেলা পর্যন্ত ৪০ কিলোমিটারের ভাড়া ২২৬৬ টাকা থেকে ২৩৯৮ টাকা এবং এসি-ফ্রিজার ভ্যানের জন্য ২৪৮৬ টাকা, রাউজান উপজেলা পর্যন্ত ৬৪ কিলোমিটারের ভাড়া ২৬৩৫ টাকা থেকে ২৮৪৬ টাকা এবং এসি-ফ্রিজার ভ্যানের জন্য ২৯৮৭ টাকা, রাঙ্গুনিয়া উপজেলা পর্যন্ত ৬০ কিলোমিটারের ভাড়া ২৫৭৪ টাকা থেকে ২৭৭২ টাকা এবং এসি-ফ্রিজার ভ্যানের জন্য ২৮০৪ টাকা, লোহাগাড়া উপজেলা পর্যন্ত ১৩৪ কিলোমিটারের ভাড়া ৩১৭৩ টাকা থেকে ৪১৫৫ টাকা এবং এসি-ফ্রিজার ভ্যানের জন্য ৪৪৫০ টাকা, সাতকানিয়া উপজেলা পর্যন্ত ১১৬ কিলোমিটারের ভাড়া ৩৪৩৬ টাকা থেকে ৩৮১৯ টাকা এবং এসি-ফ্রিজার ভ্যানের জন্য ৪০৭৪ টাকা, সীতাকুণ্ড উপজেলা পর্যন্ত ৮৬ কিলোমিটারের ভাড়া ২৯৭৪ টাকা থেকে ৩২৫৮ টাকা এবং এসি-ফ্রিজার ভ্যানের জন্য ৩৪৪৭ টাকা, হাটহাজারী উপজেলা পর্যন্ত ৩৬ কিলোমিটারের ভাড়া ২২০৪ টাকা থেকে ২৩২৩ টাকা এবং এসি-ফ্রিজার ভ্যানের জন্য ২৪০২ টাকা। নির্ধারিত স্পট থেকে যদি কোনো গলি বা গ্রামের ভেতরের রাস্তা দিয়ে প্রবেশ করতে হয়, তাহলে মূল ভাড়ার সাথে অতিরিক্ত ৫০০ টাকা যুক্ত হবে বলে তালিকায় উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে এই ভাড়ার চেয়েও বেশি আদায় করা হচ্ছে বলে অভিযোগ ভুক্তভোগীদের। এই প্রতিবেদক একটি লাশ ছোট নন-এসি অ্যাম্বুলেন্সে চমেক মর্গ থেকে রাউজানে নিতে চাইলে দাবি করা হয় ৩ হাজার ৮শ টাকা। অথচ প্রকৃত ভাড়া হওয়ার কথা সর্বোচ্চ ৩১৩৫ টাকা। নিলয় হাসান নামের এক ব্যক্তি বলেন, হাসপাতাল থেকে লোহাগাড়ার বড়হাতিয়া গ্রামে লাশ নিতে চাইলে তার কাছে ৭ হাজার টাকা দাবি করে চালক। অথচ নির্ধারিত মূল্য ৩৬৭৩ টাকা। পরে সাড়ে ৫ হাজার টাকায় যেতে রাজি হয়।
চমেক মর্গ থেকে লাশ নিয়ে গাজীপুর যাওয়া মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘একটি ফ্রিজার অ্যাম্বুলেন্স ভাড়ায় নিয়েছিলাম ২২ হাজার টাকায়। এটা মালিক সমিতির লোকজন নির্ধারণ করে দিয়েছিল। অথচ বাইরে থেকে আরও কম ভাড়ায় যেতে পারতাম। ভাড়া নেওয়ার পর সমিতির লোকজন ওয়েটিং চার্জসহ বিভিন্ন অজুহাতে আরও টাকা দাবি করে’।
জানা গেছে, সরকারি ৪টি ছাড়া অ্যাম্বুলেন্স মালিক সমিতির অধীনে ১৫০টি এসি ও নন এসি অ্যাম্বুলেন্স রয়েছে। এর বাইরে আছে আরও দেড়শ অ্যাম্বুলেন্স, যেগুলো সমিতির অন্তর্ভুক্ত নয়। চমেক হাসপাতাল পূর্ব গেইট থেকে পশ্চিম গেইট এলাকার সড়কের পাশে সারি সারি অ্যাম্বুলেন্স পার্কিংয়ে রাখা। পাঁচলাইশ ২ নম্বর সড়কেও আছে কিছু অ্যাম্বুলেন্স। এখানেই ফুটপাতের ওপর অ্যাম্বুলেন্স মালিকদের কার্যালয়। তাদের কারও আছে ফার্মেসি-ওষুধের ব্যবসা কিংবা সার্জিক্যাল সামগ্রী বিক্রির ব্যবসা, কারও আছে ক্লিনিক-ডায়াগনস্টিক সেন্টারে অংশীদারত্ব, আর কেউ আছেন অন্য ব্যবসায়। হাসপাতালের চতুর্থ শ্রেণির ৫-৬ জন কর্মচারীও অ্যাম্বুলেন্সের মালিক।
অপরদিকে মালিকের অজ্ঞাতে চালকরা অ্যাম্বুলেন্স ব্যবহার করছে মাদক পাচারসহ নানান অপরাধে জড়িতদের কাজে। গত ৫ মে দুপুরে কোতোয়ালী থানাধীন ব্রিকফিল্ড রোড পাথরঘাটা এলাকা থেকে অ্যাম্বুলেন্সে ইয়াবা পাচারের অভিযোগে চালক চন্দনাইশের দোহাজারী পৌরসভার আলীপাড়া এলাকার শহিদুল ইসলাম খান সাগর (২৭) ও তার সহযোগী মো. আফসারকে (৩৩) গ্রেপ্তার করে পুলিশ। কোতোয়ালী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আফতাব উদ্দিন জানান, কক্সবাজার থেকে ওই অ্যাম্বুলেন্সে ইয়াবা নিয়ে ঢাকায় যাওয়ার সময় অক্সিজেন সিলিন্ডারের ভেতর থেকে ১ লাখ ৫ হাজার ইয়াবা উদ্ধার করা হয়।
সরেজমিন দেখা গেছে, অ্যাম্বুলেন্স মালিকদের নিয়োগকৃত দালালরা রোগী ধরতে জরুরি বিভাগের সামনে এবং অন্য বহির্গমন পথে সার্বক্ষণিক নজরদারিতে থাকে। হাসপাতালের ওয়ার্ড ঘুরে ঘুরে রোগী বা লাশের স্বজনকে অ্যাম্বুলেন্স ভাড়া করতে চাপ দেয় তারা, বিনিময়ে পায় কমিশন। উপজেলা থেকে আসা অ্যাম্বুলেন্স থেকে রোগী নামিয়ে দিয়েই চলে যেতে হয় চালককে। সিরিয়ালের অ্যাম্বুলেন্স ছাড়া অন্য কোনো গাড়িতে রোগী নিতে গেলেই আসে বাধা। তাদের ঠিক করে দেওয়া ভাড়াতেই যেতে বাধ্য করা হয়।
চমেক হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলছে, রোগী ও লাশ পরিবহন সিন্ডিকেটের স্বেচ্ছাচারিতা রোধে ২০১৮ সালে নীতিমালা প্রণয়ন করা হয় এবং ওই বছরের ১ এপ্রিল থেকে নীতিমালার ভিত্তিতে অ্যাম্বুলেন্স চলাচল কার্যকর হয়। সংশোধিত নীতিমালা করার পর ২০২৫ সাল থেকে নতুন ভাড়ার তালিকা মানার নির্দেশনা রয়েছে। বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্স মালিক সমিতির নেতাদের নীতিমালা অনুসারে পাঁচটি গাড়ি সিরিয়ালে রেখে অ্যাম্বুলেন্স চালাতে বলা হয়েছে।
চট্টগ্রাম অ্যাম্বুলেন্স মালিক সমবায় সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. আমান উল্লাহ চৌধুরী জানান,‘দেশ স্বাধীনের পর থেকে এখন পর্যন্ত সকল বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্স বিআরটিএ কর্তৃক ‘ভাড়ায় চালিত নয়’ মর্মে অর্থাৎ ব্যক্তিগত ব্যবহারের গাড়ি হিসেবে নিবন্ধিত হয়। ফলে ব্যক্তিগত গাড়ির আয়কর আরোপিত হয়। বর্তমানে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ মোট পাঁচ বছরের অগ্রিম আয়কর আদায়ের নির্দেশ দিয়েছে, যা অ্যাম্বুলেন্স মালিকদের জন্য কষ্টকর। এই পরিস্থিতিতে প্রায় সকল অ্যাম্বুলেন্সের কাগজপত্র হালনাগাদ করা সম্ভব হয়নি, যা সড়ক পরিবহন (ট্রাফিক) আইনের পরিপন্থী হওয়ায় আমরা অ্যাম্বুলেন্স পরিচালনা করতে পারছি না। অথচ সড়ক পরিবহন আইনে অ্যাম্বুলেন্সকে বাণিজ্যিকভাবে নিবন্ধন ও অন্যান্য ট্যাক্স, ব্যক্তিগত গাড়ির আয়কর নেওয়ার বিধান রয়েছে। এ বিধান বাস্তবায়ন হলে বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্স বাণিজ্যিকভাবে ব্যক্তিগত গাড়ির আয়কর প্রদানের সুযোগ পাবে’।
চট্টগ্রাম অ্যাম্বুলেন্স মালিক সমবায় সমিতির সভাপতি মো. ইউসুফ বলেন, ‘অ্যাম্বুলেন্স সেবা মানুষের জীবন রক্ষা ও জরুরি চিকিৎসা সহায়তার সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত। জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধির কারণে পূর্বের ভাড়ায় রোগী বা লাশ পরিবহন সম্ভব হয় না। ঘোষিত নীতিমালা অনুযায়ী হাসপাতালের কর্মচারী কর্তৃক রোগী ও লাশ পরিবহনে একটি নিয়ন্ত্রণ কক্ষ চালু হয়েছিল। করোনাকালীন সময়ে নিয়ন্ত্রণ কক্ষের কার্যক্রম বন্ধের পর পুনরায় অনিয়ম ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়। চমেক হাসপাতাল পরিচালককে অভিযোগ জানানোর সুবিধার্থে একটি হেল্পলাইন চালু করা, সার্বিক বিষয় এবং ভাড়ার তালিকা পুনর্মূল্যায়ন ও সংশোধনীর লক্ষ্যে দ্বি-পাক্ষিক আলোচনার আবেদন জানিয়েছি’।
অপরাধ ঘোষনা aporadhghoshona
