শিরোনাম
Home / অপরাধ / চসিকে কলমের খোঁচায় কোটি কোটি টাকার রাজস্ব মূহুর্তেই উধাও

চসিকে কলমের খোঁচায় কোটি কোটি টাকার রাজস্ব মূহুর্তেই উধাও

নিজস্ব প্রতিবেদক : বছরের পর বছর প্রশাসনিক নিয়ম-কানুনের তোয়াক্কা না করেই কাগজে-কলমে বদলে দেওয়া হয়েছে কোটি কোটি টাকার করের হিসাব। কোথাও হয়নি আনুষ্ঠানিক শুনানি, কোথাও নেওয়া হয়নি দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্তৃপক্ষের অনুমোদন। অথচ একটি সিদ্ধান্তেই বিপুল অঙ্কের কর কমে গেছে হয়ে কয়েক লাখ টাকায়, যার ফলে নীরবে বড় ধরনের রাজস্ব ক্ষতির মুখে পড়েছে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক)। সাম্প্রতিক এক নিরীক্ষা প্রতিবেদনে এমন একাধিক ঘটনার তথ্য উঠে এসেছে, যা নগর প্রশাসনের আর্থিক ব্যবস্থাপনায় গুরুতর অনিয়মের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

প্রশাসনিক কাঠামোর ভেতরে থেকে কিছু কর্মকর্তা নিজেদের ক্ষমতার অপব্যবহার করে নিয়মবহির্ভূতভাবে কর কমিয়ে দেওয়ার মাধ্যমে প্রভাবশালী প্রতিষ্ঠানগুলোকে অবৈধ সুবিধা দিয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। অবসর গ্রহণের পর এসব কর্মকর্তারা অনেক সময় দায়মুক্ত থেকেছেন, ফলে অনিয়মের দায় নির্ধারণ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। তবে সাম্প্রতিক এক নিরীক্ষা কার্যক্রমে সেই দীর্ঘদিনের অনিয়ম ও দুর্নীতির চিত্র আবারও সামনে এসেছে, যেখানে স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে কীভাবে বিধি লঙ্ঘন করে কর কমানোর মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ সরকারি রাজস্ব ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের অডিট শাখার নিরীক্ষা দলের অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের রাজস্ব বিভাগের ভেতরে দীর্ঘদিন ধরে চলা এক ধরনের প্রশাসনিক কারসাজির চিত্র। নিরীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চসিকের রাজস্ব বিভাগের সাবেক দুই কর কর্মকর্তা মেজবাহ উদ্দিন ও রূপন কান্তি চৌধুরী বিধি লঙ্ঘন করে দুটি ৩ তারকা মানের আবাসিক হোটেল প্রতিষ্ঠানকে অবৈধ সুবিধা প্রদান করেছেন। এতে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের প্রায় ১০ কোটি ২৭ লাখ টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে বলে নিরীক্ষা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। বিষয়টি শুধু প্রশাসনিক অনিয়মের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং পরিকল্পিতভাবে কর কমানোর মাধ্যমে সরকারি অর্থের ক্ষতি করার একটি সুস্পষ্ট উদাহরণ হিসেবেও বিবেচনা করা হচ্ছে।

চসিক সূত্রে জানা গেছে, অবৈধ সুবিধা পাওয়া দুটি তিন তারকা মানের হোটেলের নাম আগ্রাবাদ হোটেল লিমিটেড ও সেন্ট মার্টিন হোটেল লিমিটেড। এই দুই প্রতিষ্ঠানের কর নির্ধারণ ও আপিল নিষ্পত্তির পুরো প্রক্রিয়া নিয়মবহির্ভূতভাবে পরিচালিত হয়েছে বলে নিরীক্ষা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। কর নির্ধারণ থেকে শুরু করে আপিল নিষ্পত্তি পর্যন্ত প্রতিটি ধাপেই প্রযোজ্য বিধি ও নিয়ম উপেক্ষা করা হয়েছে, যা প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার ক্ষেত্রে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করেছে। নিরীক্ষা প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, আপিল নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে বাধ্যতামূলক শুনানি, রিভিউ বোর্ডের অনুমোদন এবং মেয়রের সম্মতি নেওয়ার বিধান থাকলেও বাস্তবে এসব কোনো প্রক্রিয়াই অনুসরণ করা হয়নি।

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের অঞ্চল-৭ এর ২০২২-২০২৩ এবং ২০২৩-২০২৪ অর্থবছরের নিরীক্ষা কার্যক্রমের সময় এই অনিয়মগুলো ধরা পড়ে। নিরীক্ষা প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, সিটি কর্পোরেশন ট্যাক্সেশন রুলস, ১৯৮৬ অনুযায়ী আপিল রিভিউ বোর্ডের মাধ্যমে শুনানি গ্রহণ এবং মেয়রের অনুমোদন নেওয়া বাধ্যতামূলক। কিন্তু সংশ্লিষ্ট দুই কর কর্মকর্তা এই বিধান সম্পূর্ণভাবে উপেক্ষা করে নিজেদের ক্ষমতার অপব্যবহার করেছেন। ফলে কর নির্ধারণের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও আইনি কাঠামো বজায় রাখা সম্ভব হয়নি এবং সরকারি রাজস্ব মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

নিরীক্ষা প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, নগরীর ৩৬ নম্বর ওয়ার্ডের গোসাইল ডাঙ্গা এলাকায় অবস্থিত আগ্রাবাদ হোটেল লিমিটেডের বার্ষিক গৃহকর প্রথমে ৮ কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়েছিল। এটি ছিল সংশ্লিষ্ট সম্পত্তির আয়তন, ব্যবহার ও ব্যবসায়িক কার্যক্রমের ওপর ভিত্তি করে নির্ধারিত একটি নিয়মিত কর। কিন্তু ২০১৭ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর আপিলের পর তৎকালীন কর কর্মকর্তা মেজবাহ উদ্দিন কোনো ধরনের নিয়মনীতি অনুসরণ না করে নিজ ক্ষমতাবলে সেই কর কমিয়ে মাত্র ৮৫ লাখ টাকা নির্ধারণ করেন। এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে কোনো ধরনের শুনানি অনুষ্ঠিত হয়নি এবং মেয়রের অনুমোদনও নেওয়া হয়নি বলে নিরীক্ষা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

হোল্ডিং ট্যাক্স রেকর্ড, আপিল ফরম, প্রসিডিং, ফিল্ড বুক, অ্যাসেসমেন্ট লিস্ট এবং ট্যাক্স লেজার পর্যালোচনা করে নিরীক্ষা দল দেখতে পায় যে সিটি কর্পোরেশন ট্যাক্সেশন রুলস, ১৯৮৬-এর ১১ ও ১২ ধারা অনুযায়ী মেয়রের নেতৃত্বে রিভিউ কমিটির মাধ্যমে শুনানি হওয়ার বাধ্যবাধকতা থাকলেও তা সম্পূর্ণ উপেক্ষা করা হয়েছে। ফলে এক ধাক্কায় প্রায় ৭ কোটি ১৫ লাখ টাকা কর কমিয়ে দেওয়া হয়, যা সরাসরি চসিক ও সরকারের রাজস্ব ক্ষতি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

একই ধরনের অনিয়মের ঘটনা ধরা পড়ে একই ওয়ার্ডে অবস্থিত আরেকটি তিন তারকা মানের প্রতিষ্ঠান সেন্ট মার্টিন হোটেল লিমিটেডের ক্ষেত্রেও। নিরীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রতিষ্ঠানটির গৃহকর প্রথমে ৩ কোটি ৩০ লাখ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছিল। কিন্তু ২০১৭ সালের ২ অক্টোবর আপিলের পর ২০২২ সালের ১০ মে তৎকালীন কর কর্মকর্তা রূপন কান্তি চৌধুরীর স্বাক্ষরে একটি শুনানির নোটিশ জারি করা হয়। পরবর্তীতে অস্বাভাবিকভাবে সেই কর কমিয়ে ২২ লাখ টাকা নির্ধারণ করা হয়।

এখানেই শেষ হয়নি কর কমানোর প্রক্রিয়া। নিরীক্ষা প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, পরবর্তীতে কোনো ধরনের নোটিশ ছাড়াই দ্বিতীয়বার আপিল নিষ্পত্তি দেখিয়ে করের পরিমাণ আরও কমিয়ে ১৮ লাখ টাকায় নামিয়ে আনা হয়। পুরো প্রক্রিয়ায় আপিল রিভিউ বোর্ডের চেয়ারম্যান তথা মেয়রের কোনো অনুমোদন ছিল না বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এতে প্রায় ৩ কোটি ১২ লাখ টাকা রাজস্ব ক্ষতি হয়েছে, যা নিরীক্ষা প্রতিবেদনে “অস্বাভাবিক” হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।

নিরীক্ষা প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, দুই ক্ষেত্রেই সিটি কর্পোরেশন ট্যাক্সেশন রুলস, ১৯৮৬-এর ১১ ও ১২ ধারা লঙ্ঘন করে আপিল নিষ্পত্তির নামে কর কমানো হয়েছে। বাধ্যতামূলক রিভিউ কমিটি ও মেয়রের অনুমোদন ছাড়াই নেওয়া এসব সিদ্ধান্ত সরাসরি বিধিবহির্ভূত এবং প্রশাসনিক শৃঙ্খলার পরিপন্থী। নিরীক্ষা দলের মতে, সংশ্লিষ্ট কর কর্মকর্তারা করদাতাকে বিশেষ সুবিধা দেওয়ার উদ্দেশ্যে পরিকল্পিতভাবে কর কমিয়েছেন, যা শুধু প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়, বরং সংশ্লিষ্টদের মধ্যে সুস্পষ্ট যোগসাজশের ইঙ্গিত দেয়।

এই ধরনের অনিয়মের ফলে একদিকে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন বিপুল পরিমাণ রাজস্ব হারাচ্ছে, অন্যদিকে প্রভাবশালী প্রতিষ্ঠানগুলো অবৈধ সুবিধা পাচ্ছে। ফলে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং আর্থিক শৃঙ্খলা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। প্রশাসনিক কাঠামোর ভেতরে থেকে যদি নিয়ম লঙ্ঘন করে কর কমানো হয়, তাহলে তা শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের ক্ষতির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং সামগ্রিকভাবে নগর উন্নয়ন কার্যক্রমেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের রাজস্ব বিভাগের অঞ্চল-৭ এর বর্তমান কর কর্মকর্তা এ.কে.এম. সালাহউদ্দিন জানান,’আগ্রাবাদ হোটেল লিমিটেড ও সেন্ট মার্টিন হোটেল লিমিটেডের গৃহকর কমানোর ঘটনায় আইন কর্মকর্তা মহিউদ্দিন মুরাদকে প্রধান করে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে চসিক। তদন্ত কমিটি ইতোমধ্যে প্রয়োজনীয় নথিপত্র সংগ্রহ শুরু করেছে এবং বিষয়টি যাচাই-বাছাই করে প্রতিবেদন দেবে বলে তিনি জানান।’

তবে তদন্ত কমিটির মতামত এবং এই ঘটনায় সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হবে, সে বিষয়ে জানতে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের সচিব মোহাম্মদ আশরাফুল আমিন এবং আইন উপদেষ্টা মহিউদ্দিন মুরাদের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে ক্ষুদে বার্তা পাঠানো হলেও কোনো জবাব পাওয়া যায়নি।

নিরীক্ষা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, এই ধরনের অনিয়ম যদি যথাসময়ে শনাক্ত করা না হয় এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ না করা হয়, তাহলে ভবিষ্যতেও একই ধরনের ঘটনা ঘটতে পারে। ফলে প্রশাসনিক কাঠামোর ভেতরে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে নিয়মিত নিরীক্ষা কার্যক্রম জোরদার করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। একই সঙ্গে কর নির্ধারণ ও আপিল নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে বিদ্যমান বিধি কঠোরভাবে অনুসরণ করা এবং প্রতিটি সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে যথাযথ অনুমোদন নিশ্চিত করা জরুরি বলে মত দিয়েছেন প্রশাসনিক বিশেষজ্ঞরা।

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মতো একটি বড় নগর প্রশাসনের ক্ষেত্রে রাজস্ব আয়ের ওপরই নির্ভর করে বিভিন্ন উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়। সড়ক উন্নয়ন, ড্রেনেজ ব্যবস্থা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, আলোকায়ন এবং জনসেবামূলক বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন হয় বিপুল পরিমাণ অর্থ। সেখানে যদি কর নির্ধারণ ও আদায়ের ক্ষেত্রে অনিয়ম ঘটে এবং পরিকল্পিতভাবে কর কমিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে নগর উন্নয়ন কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হওয়া স্বাভাবিক বলে মনে করে সুশীল সমাজ।

Check Also

ন্যাচার কনভেনশনে চট্টগ্রামকে গ্রীন, ক্লিন ও হেলদি সিটিতে রুপান্তরের ঘোষণা চসিক মেয়রের

বিশ্ব পরিবেশ দিবস উপলক্ষে সেভ দ্যা নেচার অব বাংলাদেশ- চট্টগ্রাম মহানগর শাখা কর্তৃক আয়োজিত “ন্যাচার …