
কক্সবাজার প্রতিনিধি: টানা কয়েক দিনের ভারী বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে কক্সবাজারের চকরিয়া, পেকুয়া, মাতামুহুরী, রামু, উখিয়া, টেকনাফ ও সদর উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। মাতামুহুরী নদীর পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় নিম্নাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি ঘটেছে।
এতে জেলার লাখো মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। সড়ক যোগাযোগ ব্যাহত হওয়ায় স্বাভাবিক জনজীবনও মারাত্মকভাবে বিপর্যস্ত হয়েছে।
জেলা প্রশাসন ও স্থানীয় প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, বন্যা, পাহাড়ধস, দেয়ালধস ও পানিতে ডুবে এ পর্যন্ত জেলায় ২৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরে পাহাড়ধসে ১৮ জন এবং জেলার বিভিন্ন এলাকায় পাহাড়ধস, দেয়ালধস ও পানিতে ডুবে আরও সাতজন নিহত হয়েছেন।
শুক্রবার (১০ জুলাই) দুপুরে চকরিয়া উপজেলার হারবাং সেতু এলাকায় নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার পথে নৌকাডুবির ঘটনায় আব্দুল মালেকের ১২ বছর বয়সী মেয়ে হাসনাতুল জান্নাত ঝর্ণার মৃত্যু হয়। এর আগে টানা বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলের পানিতে ডুবে চকরিয়ার কাকারা ইউনিয়নের দুই বছরের ওয়াকিম এবং মাতামুহুরী উপজেলার কোনাখালী ইউনিয়নের তিন বছরের পুষ্প মারা যায়।
উপজেলা প্রশাসন জানিয়েছে, নিহতদের পরিবারকে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়েছে।এদিকে, চকরিয়া উপজেলার বরইতলী ইউনিয়নের মোহছেনিয়াকাটা (ডবলতলী) এলাকায় ভোররাতে পাহাড়ধসে দুই ভাইবোন নিহত হন। তারা হলেন তৌসিফ মিয়া (১৩) ও রুমি আক্তার (১৭)। এ ঘটনায় আরও একজন আহত হয়েছেন। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শাহীন দেলোয়ার পাহাড়ধসে মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
চকরিয়া উপজেলার কাকারা, কৈয়ারবিল, লক্ষ্যারচর, ফাঁসিয়াখালী, বরইতলী, বমুবিলছড়ি, ডুলাহাজারা, সাহারবিল ও সুরাজপুর-মানিকপুর ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ এলাকা পানিতে তলিয়ে গেছে। চকরিয়া পৌরসভার হাসপাতালপাড়া, থানা সেন্টার ও নিউমার্কেট এলাকায় সড়কে পানি জমে যান চলাচল ব্যাহত হচ্ছে।
পেকুয়ার মেহেরনামা এলাকায় বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় লোকালয়ে পানি প্রবেশ করেছে। সদর, শীলখালীসহ আশপাশের নিম্নাঞ্চলও প্লাবিত হয়েছে। অন্যদিকে মাতামুহুরী উপজেলার পূর্ব বড়ভেওলা, ঢেমুশিয়া, কোনাখালী, বিএমচর ও সাহারবিল ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ এলাকা এখনো পানির নিচে।
চকরিয়া, পেকুয়া ও মাতামুহুরী উপজেলার বিভিন্ন সড়ক ও মহাসড়কের ওপর পানি উঠে যাওয়ায় যান চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। অনেক এলাকায় বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বাজার ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমও সীমিত হয়ে পড়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, কয়েক দিনের টানা বৃষ্টিতে ঘরবাড়ি, সড়ক ও কৃষিজমি পানির নিচে তলিয়ে গেছে। অনেক পরিবার শুকনো খাবার খেয়ে দিন পার করছে। রান্নাবান্নাও ব্যাহত হচ্ছে।
জেলা প্রশাসন জানিয়েছে, পাহাড়ের পাদদেশে ঝুঁকিপূর্ণভাবে বসবাসকারীদের নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নিতে মাইকিং করা হচ্ছে। জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় কন্ট্রোল রুম চালু রাখা হয়েছে। পানি দ্রুত নিষ্কাশনের জন্য স্লুইস গেট খুলে দেওয়া হয়েছে। এছাড়া জেলার ৬৪৮টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
চকরিয়া ও মাতামুহুরীর বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দারা জানান, কৃষিজমি, আমনের বীজতলা ও চিংড়ির ঘের পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় ব্যাপক ক্ষতির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। জলাবদ্ধতা দীর্ঘস্থায়ী হলে কৃষি ও মৎস্য খাতে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে পারেন স্থানীয়রা।
কক্সবাজার আবহাওয়া অফিসের সহকারী আবহাওয়াবিদ মো. আব্দুল হান্নান জানান, গত ২৪ ঘণ্টায় জেলায় ১০৩ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। কক্সবাজার সমুদ্রবন্দরে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্কসংকেত বহাল রয়েছে। আগামী কয়েক দিনও বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকতে পারে বলে তিনি জানান।
কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান দুর্গত এলাকা পরিদর্শন করে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের মধ্যে ত্রাণসামগ্রী বিতরণ করছেন। জেলার সব উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে (ইউএনও) নিজ নিজ এলাকায় ত্রাণ ও উদ্ধার কার্যক্রম তদারকির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।এদিকে, আলহাজ শাহজাহান চৌধুরী ও লুৎফুর রহমান কাজলও দুর্গত বিভিন্ন এলাকা পরিদর্শন করে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের মধ্যে ত্রাণ বিতরণ করেছেন।
অপরাধ ঘোষনা aporadhghoshona
