শিরোনাম
Home / চট্টগ্রাম /  বন্যায় তলিয়ে গেল মাছের ঘের-পুকুর, বড় ধাক্কা মৎস্য খাতে

 বন্যায় তলিয়ে গেল মাছের ঘের-পুকুর, বড় ধাক্কা মৎস্য খাতে

নিজস্ব প্রতিবেদক : ভারী বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে চট্টগ্রামে ভয়াবহ বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। এতে মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়েছেন জেলার হাজারো মৎস্যচাষি। আকস্মিক বন্যার পানিতে শত শত হেক্টর আয়তনের মাছের ঘের, পুকুর ও জলাশয় তলিয়ে যাওয়ায় ভেসে গেছে চাষকৃত মাছ। এতে কোটি কোটি টাকার ক্ষতির আশঙ্কা করছেন ক্ষতিগ্রস্তরা। অনেক চাষি সারা বছরের বিনিয়োগ হারিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। এছাড়া বন্যার পানিতে ডুবে গেছে বসতভিটা, ফসলি জমি, সড়ক এবং বিভিন্ন অবকাঠামো।বিশেষ করে জেলার দক্ষিণাঞ্চলের সাতকানিয়া ও বাঁশখালী উপজেলায় বন্যার তীব্রতা সবচেয়ে বেশি।একই সাথে চন্দনাইশ, লোহাগাড়া, বোয়ালখালী ও আনোয়ারা উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকা পানির নিচে তলিয়ে গেছে।
চট্টগ্রাম জেলা মৎস্য অফিসের তথ্য অনুযায়ী, জেলার ১৫টি উপজেলার ১৫৩টি ইউনিয়নে ৯ হাজার ৯৩৩টি পুকুর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এছাড়া ৩২০টি মাছের ঘেরও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত পুকুরের মোট আয়তন ৩ হাজার ২১১.৯২ হেক্টর এবং ক্ষতিগ্রস্ত মাছের ঘেরের আয়তন ৯০০ হেক্টর। প্রাথমিক হিসাবে মোট ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ৯১ কোটি টাকা।
উপজেলা মৎস্য বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, ক্ষয়ক্ষতির প্রাথমিক তথ্য সংগ্রহ শুরু হয়েছে। বন্যার পানি না কমায় প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ এখনো নির্ধারণ করা সম্ভব হয়নি। তাদের মতে, পানি নেমে গেলে ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়তে পারে। তবে এই বন্যায় মিঠা পানির মাছের বাজারে বড় ধাক্কা আসবে।
জেলা মৎস্য কর্মকর্তা সালমা বেগম বলেন, টানা ভারী বৃষ্টি ও বন্যার কারণে জেলার বিভিন্ন উপজেলার অসংখ্য মাছের ঘের, পুকুর ও মৎস্য প্রকল্প পানিতে তলিয়ে গেছে। এতে বিপুল পরিমাণ মাছ ভেসে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তবে এখনো ক্ষয়ক্ষতির সুনির্দিষ্ট পরিমাণ নির্ধারণ করা সম্ভব হয়নি। আমাদের কর্মকর্তারা মাঠপর্যায়ে প্রাথমিক তথ্য সংগ্রহের কাজ করছেন। তিনি বলেন, মিরসরাইয়ে সরকারি একটি মৎস্য প্রকল্প ইতোমধ্যে বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে। এছাড়া পটিয়ার আরেকটি সরকারি মৎস্য প্রকল্পও ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে, যা যেকোনো সময় প্লাবিত হতে পারে। পানি নেমে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ করে ক্ষতিগ্রস্ত মৎস্যচাষিদের তালিকা প্রস্তুত করা হবে। এরপর সেই তথ্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠিয়ে প্রয়োজনীয় সহায়তার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
তিনি আরও বলেন, বন্যাদুর্গত মৎস্যচাষি ও মৎস্যজীবীদের সহায়তায় জেলা মৎস্য দপ্তরের কর্মকর্তারা সার্বক্ষণিক কর্মস্থলে থেকে কাজ করছেন। ক্ষয়ক্ষতি কমিয়ে আনতে তারা নিয়মিতভাবে মৎস্যচাষিদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিচ্ছেন। চট্টগ্রাম মহানগর ও উপজেলার মৎস্যজীবীরা নিরাপদে ঘাট ও উপকূলীয় এলাকায় অবস্থান করছেন। এখন পর্যন্ত কোনো মৎস্যজীবী নিখোঁজ হওয়ার তথ্য পাওয়া যায়নি। আমরা সার্বক্ষণিক তাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছি।
সাতকানিয়া উপজেলার বাজলিয়া গ্রামের মৎস্যচাষি সাইফুল হোসেন বলেন, পাহাড়ি ঢল ও বন্যার পানিতে আমার পাঁচটি পুকুর তলিয়ে গেছে। প্রথম দিকে জাল দিয়ে মাছ রক্ষা করার চেষ্টা করেছিলাম। কিন্তু গত বৃহস্পতিবার থেকে পানি এত বেড়েছে যে সব চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে। এখন মাছ বাঁচানোর কোনো আশা নেই। আমার পাঁচটি পুকুর থেকে প্রায় ৪০ থেকে ৫০ লাখ টাকার মাছ পানিতে ভেসে গেছে। বৃষ্টি থামার পর মাছ আহরণের পরিকল্পনা ছিল, কিন্তু বন্যায় সব শেষ হয়ে গেছে। শুধু আমার নয়, সাতকানিয়ার প্রায় সব মাছের প্রকল্পই পানির নিচে তলিয়ে গেছে।

বাঁশখালী উপজেলার মৎস্যচাষি আনোয়ার হোসেন বলেন, টানা বৃষ্টিতে আমার প্রায় ৬ হেক্টর আয়তনের মাছের ঘের পানিতে তলিয়ে গেছে। এতে ঘেরের মাছ ভেসে গেছে। আমার প্রায় এক কোটি টাকার ক্ষতি হতে পারে। এই ক্ষতিতে আমি সর্বস্বান্ত হয়ে গেছি।
এদিকে বন্যার পানিতে চন্দনাইশ উপজেলায় ৩৩৮টি মাছের পুকুর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত পুকুরগুলোর মোট আয়তন প্রায় ৯২ হেক্টর। উপজেলা মৎস্য বিভাগের প্রাথমিক হিসেবে, এতে প্রায় ৫ কোটি ৯৩ লাখ টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
চন্দনাইশ উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা তানবীর হোসেন বলেন, টানা বৃষ্টি ও বন্যার পানিতে উপজেলার ৩৩৮টি মাছের পুকুর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। প্রায় ৯২ হেক্টর জলাশয়ের মাছ ভেসে গেছে বা ক্ষতির মুখে পড়েছে। আমাদের প্রাথমিক হিসেবে ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৫ কোটি ৯৩ লাখ টাকা। ক্ষতিগ্রস্ত মৎস্যচাষিদের তালিকা প্রস্তুত করা হচ্ছে এবং ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে প্রতিবেদন পাঠানো হবে।
জানা গেছে, দক্ষিণ চট্টগ্রামের সবচেয়ে বড় মিঠা পানির মাছের বাজারগুলোর একটি আনোয়ারা উপজেলার কালাবিবির দিঘির মোড়ের মৎস্য আড়ত। এখানে দক্ষিণ চট্টগ্রামের সবচেয়ে বেশি মিঠা পানির মাছের বেচাকেনা হয়।
শাহ আমানত মৎস্য গদির স্বত্বাধিকারী মোশাররফ হোসেন সোহেল বলেন, গত বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ মাসে চাষিরা পুকুর ও মাছের প্রকল্পে পোনা অবমুক্ত করেছিলেন। এখন সেই মাছের ওজন হওয়ার সময়। কিন্তু বন্যার পানিতে দক্ষিণ চট্টগ্রামের অধিকাংশ পুকুর ও ঘেরের মাছ ভেসে গেছে। এর প্রভাব খুব শিগগিরই বাজারে পড়বে। আমাদের এই আড়তে প্রতিদিন প্রায় ৩০ লাখ টাকার মিঠা পানির মাছ বিক্রি হয়। তবে বন্যায় মাছ ভেসে যাওয়ায় আগামী দুই থেকে তিন মাস বাজারে মাছের সরবরাহে বড় ধরনের সংকট দেখা দিতে পারে।

 

Check Also

হাটহাজারীতে মাছ ধরতে গিয়ে মেয়ের সামনে বাবাকে কুপিয়ে হত্যা

হাটহাজারী প্রতিনিধি: হাটহাজারীতে মাছ ধরতে গিয়ে মেয়ের সামনে নুরুল আজিম প্রকাশ আজম (৪০) নামে এক …