নিজস্ব প্রতিবেদক: চট্টগ্রামে আদালত চলাকালে এজলাস কক্ষে মামলার বাদীকে গলায় ছুরিকাঘাতে চাঞ্চল্যকর হত্যাচেষ্টার ঘটনার ১৫ দিন পেরিয়ে গেলেও গ্রেফতার হয়নি কোন আসামী। উল্টো ভুক্তভোগীকে স্ব-পরিবারে হত্যার হুমকি দিয়ে যাচ্ছেন আসামিরা। তাদের অব্যাহত হুমকিতে জীবন রক্ষায় ভুক্তভোগী পালিয়ে বেড়ালেও পুলিশ বলছে আসামিদের খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।
গত ৬ সেপ্টেম্বর দুপুর ২টার দিকে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত -৩ এর এজলাস কক্ষে ব্যবসায়ী নূরুল কবির একটি মামলায় গ্রেপ্তারকৃত আসামিদের জামিনের বিরোধিতা করার জন্য আদালতে উপস্থিত হলে আদালত চলাকালে উক্ত মামলার অন্য আসামীরা সংঘবদ্ধ হয়ে এমন ন্যাক্কারজনক ঘটনা ঘটায়।
ঘটনার পর পর বিচারকের নির্দেশে দায়িত্বরত পুলিশ আহত ব্যবসায়ী নূরুল কবিরকে রক্তাক্ত অবস্থায় উদ্ধার করে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যায়। পরবর্তীতে ৭ সেপ্টেম্বর নূরুল কবিরের স্ত্রী রুনা আক্তার বাদী হয়ে ইলিয়াস হোসেন অপু, মো. ইমরান, মো. আনোয়ার, জয়নাল আবেদীন সোহেল, কুলসুমা আক্তার এবং উর্মি আক্তারকে আসামি করে মামলা (নং ১২(৯)২৬)দায়ের করেন।
মামলাসূত্রে জানা যায়, পাঁচলাইশ থানাধীন হাদুমাঝি পাড়া এলাকার ব্যবসায়ী নুরুল কবির স্থানীয় সন্ত্রাসী ও চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে চাাঁদাবাজি, লুটপাট, হামলা ও চুরির ঘটনায় অন্তত চারটি মামলা দায়ের করেছিলেন। তিনি একটি মামলায় গ্রেপ্তারকৃত আসামিদের জামিনের বিরোধিতা করার জন্য আদালতে উপস্থিত হলে আদালত চলাকালে অপরাপর আসামীরা যোগসাজশে হত্যার উদ্দেশ্যে ছুরিকাঘাত করে। এসময় তার সাথে থাকা নগদ টাকা ছিনিয়ে এবং তার স্ত্রীকেও মারধর করে।
ভুক্তভোগী নূরুল কবির বলেন, তার উপর হামলাকারী ইলিয়াস হোসেন অপুসহ সকল আসামি এলাকায় বুক ফুলিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। আসামীদের ভয়ে তিনি এখনো বাসায় থাকতে না পারলেও আসামিরা ঠিকই বাসায় রাত যাপন করেন । কিন্তু পুলিশ অজানা কারণে আসামিদেরকে গ্রেফতার করছে না।
জানা গেছে, মামলার বাদী ব্যবসায়ী মোহাম্মদ নুরুল কবিরের (৪২) সাথে আসামীদের পূর্ব বিরোধ রয়েছে। বিভিন্ন ঘটনায় মামলার বাদী নুরুল কবির ও তার স্ত্রী রুনা আক্তার রূপা (৩০) বাদী হয়ে আসামীদের বিরুদ্ধে পাঁচলাইশ মডেল থানায় মামলা নং-০৩(১১)২০২৪, মামলা নং-০৪(৬)২০২৬, মামলা নং-২৩(৬)২০২৬ দায়ের করে। যাহা আদালতে বিচারাধীন এবং থানায় তদন্তাধীন আছে। এতে আসামীরা বাদীর উপর ক্ষিপ্ত হয়ে পাঁচলাইশ থানাধীন হাদুমাঝি পাড়ার সাবের মাষ্টারের বাড়ির অজিফা ম্যানশনে গত ২৮ আগষ্ট শুক্রবার জুমার নামাজ চলাকালীন সময়ে বাদীর অনুপস্থিতিতে অপু-সোহেলের নেতৃত্বে ১০/১২ জনের একটি ডাকাতদল ডাকাতির উদ্দেশ্যে নুরুল কবিরের বাড়ির সিসি ক্যামরা ভাংচুর করে বাসায় ঢুকে কবিরের স্ত্রীকে হাত-পা বেঁধে বাথরুমে আটকে রেখে নগদ ৬ লক্ষ ৫৫ হাজার টাকা এবং স্বর্ণালংকার, ল্যাপটপসহ প্রায় ১০ লক্ষ টাকার মালামাল ডাকাতি করে নিয়ে যায়। ঘটনার পর পরই সিএমপির পাঁচলাইশ থানা পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে বিভিন্ন আলামত সংগ্রহ করেন। ওইদিন সন্ধ্যায় ভুক্তভোগী নুরুল কবির থানায় ডাকাতির ঘটনায় এমরান, ফয়সাল, ইলিয়াস হোসেন অপু, জয়নাল আবেদীন সোহেল, আনোয়ার, রবিউল হাসান, জালাল আহম্মেদ পারভেজ এবং অজ্ঞাতনামা ৫/৬ জনকে আসামি করে এজাহার প্রদান করলেও পুলিশ ৩দিন পর চুরির মামলা (নং ২৪(৮)২৬) গ্রহণ করে।
জানা গেছে, এর আগে ব্যবসায়ী নূরুল কবিরের বাড়ীতে ২০২৪ সালে নগদ ১৪ লক্ষ টাকা চুরির ঘটনায় সন্ত্রাসী ইলিয়াস হোসেন অপুর বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়। ২০২৫ সালের প্রথম দিকে তাহসিন হত্যা ও চুরির মামলা থেকে জামিনে বেরিয়ে এসে ইলিয়াস হোসেন অপু নুরুল কবিরের নিকট সরাসরি ১০ লক্ষ টাকা চাঁদা দাবীসহ মামলা তুলে না নিলে ডিশ-ওয়াইফাই ব্যবসা বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি প্রদান করে। তাদের দাবীকৃত চাঁদা না দেওয়ায় গত ১ জুন জয়নাল আবেদীন সোহেল ও ইলিয়াস হোসেন অপুর নেতৃত্বে একটি সংঘবদ্ধ চক্রের সদস্যরা নুরুল কবিরকে তুলে নিয়ে সোহেলের রিক্সার গ্যারেজে আটকে রেখে ২ দিনের মধ্যে ৫ লক্ষ টাকা চাঁদা দাবী পূর্বক মারধর করে নগদ টাকা ও মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নিয়ে ছেড়ে দেয়। উক্ত ঘটনায় থানায় মামলা দায়ের করা হলে সন্ত্রাসীরা আরো ক্ষিপ্ত হয়ে পরদিন নুরুল কবিরের বাসার সামনে এসে তাকে কিরিচ দিয়ে কুপিয়ে গুরুতর আহত করে। এসময় তার স্ত্রীকেও ব্যাপক মারধর করে সন্ত্রাসীরা। উক্ত ঘটনায় আরো একটি মামলা দায়ের করা হলেও অজানা কারণে উল্লেখযোগ্য আসামিদের গ্রেফতার করেনি পুলিশ। এরপর থেকে সন্ত্রাসীরা নূরুল কবিরকে মামলা প্রত্যাহারের জন্য প্রতিনিয়ত হুমকি দিতে থাকেন। একপর্যায়ে ডিশ-ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে তার ব্যবসা বন্ধ করে দেয়। সন্ত্রাসীদের হামলার ভয়ে প্রাণ বাঁচাতে নুরুল কবির অন্যত্র বসবাস করলেও তার স্ত্রী-সন্তানেরা বাসায় থাকতেন।